Thursday, December 4, 2014

পার্বত্য শান্তি চুক্তি: সতের বছরের পোস্টমর্টেম

[published by bdnews24.com, 02.12.2014]

আজ থেকে সতের বছর আগে, ঠিক এইদিনেই, ২ ডিসেম্বর ১৯৯৭ সাল, মহাধুমধাম করে পার্বত্য চুক্তি, যা জনপ্রিয় বয়ানে ‘শান্তি চুক্তি’ নামে জারি আছে, স্বাক্ষরিত হয়েছিল। তৎকালীন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পক্ষে আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ এবং পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর পক্ষে পাবর্ত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি বাবু জ্যোতিরিন্দ্রি বোধিপ্রিয়া লারমা উরফে সন্তু লারমা এ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। যা দেশ এবং বৈদেশে বেসুমার বাহবা অর্জন করে। নানান বর্ণিল বেলুন উড়িয়ে এবং গুচ্ছ গুচ্ছ শান্তির শ্বেত-কপোত আকাশে উন্মুক্ত করে বেশ স্বাড়ম্বরতার ভেতর দিয়ে এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এ চুক্তি স্বাক্ষর করতে পারার কৃতিত্বের স্বীকৃতি হিসেবে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী, যিনি বর্তমানেও প্রধানমন্ত্রী, ইউনেস্কো শান্তি পুরস্কার লাভ করেছিলেন। এমনকি নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্যও মনোনীত হয়েছিলেন, যা শেষমেষ আর আগায়নি। আজ ঠিক সতের বছর পরে, পার্বত্য চুক্তি কেন্দ্র করে সামগ্রিক পরিবেশ ও পরিস্থিতি রীতিমতো প্রায় ‘উল্টো’। আজ এ চুক্তি স্বাক্ষরের সতের বছর পূর্তি উৎসব হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামে, বৃহত্তর চট্টগ্রামে এবং রাজধানী ঢাকায়। তবে, সেটা অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং দৃষ্টিকটুভাবে একপাক্ষিক; কেননা চুক্তির স্বাক্ষরকারী একটি পক্ষ হিসেবে রাষ্ট্র বেমালুম রিলাকটেন্ট (অনাগ্রহী)।

পাহাড়ি জনগোষ্ঠী বা এ জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠন হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি যখন এ দিনটি তাদের দাবি পেশ করবার একটা বাৎসরিক মওকা হিসেবে উদযাপন করছে, রাষ্ট্র তখন নিষ্ঠুরভাবে নির্বিকার। ফলে, পার্বত্য চুক্তির এ দিন আজ আর উৎসবের মেজাজে জারি নেই। দিনটি উদযাপন হয়, কিন্তু সেখানে আনন্দের বেলুন নেই, আছে বিশ্বাসভঙ্গের গভীর হতাশা। সেখানে শান্তির শ্বেত কপোত নেই, আছে তীব্র অসন্তুষ্টির সামষ্টিক দীর্ঘশ্বাস। কিন্তু কেন? এ নিবন্ধে তার যৎসামান্য বিচার-বিশ্লেষণ করবার প্রয়াস নেওয়া হয়েছে। পার্বত্য চুক্তি-উত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে বিস্তর গবেষণা হয়েছে, যার অধিকাংশই নন-একাডেমিক এবং এনজিও বা কনসালটেন্সি এজেন্সির বা মানবাধিকার সংস্থার রিপোর্ট। পার্বত্য চুক্তি নিয়ে এবং চুক্তির পরবর্তীতে পার্বত্য চট্টগ্রামের অবস্থা নিয়ে বস্তা বস্তা লেখালেখি হয়েছে, যার অধিকাংশই বস্তাপঁচা। নানান সেমিনার-সিম্পোজিয়াম-গোলটেবিল টক হয়েছে, সেখানে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য বিস্তর আহাজারি হয়েছে। কিন্তু দৃশ্যত এবং কার্যত সব অরণ্যে রোদন; কেননা কাজের কাজ খুব বেশি কিছু হয়েছে বলে মনে হয় না। এই জনগোষ্ঠীর জীবনের আদৌ গুণগত পরিবর্তন এসেছে কিনা; আদৌ একটি সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সমতার ভিত্তিতে ইজ্জতের সঙ্গে জীবনযাপন করবার মানসম্মত কোনো ব্যবস্থা এবং পরিস্থিতি পাহাড়ে তৈরি হয়েছে কিনা, সেটা হল মৌলিক জিজ্ঞাসা। ফলে ফি বছর চুক্তির বার্ষিকী উদযাপন এবং চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের তীব্র আহাজারি একটি সাংবাৎসরিক পলিটিক্যাল-রিচ্যুয়ালে পরিণত হয়েছে।

আর পাহাড়ের সঙ্গে কোনো ধরনের সংযোগবিহীন কিছু কিছু বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক ও সুশীল মেট্রোপলিটন আয়োজনে বসে পার্বত্য চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের বাৎসরিক বিলাপ করেন। যা হয়তো পাবর্ত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) দাবির তীব্রতায় কিঞ্চিত নোক্তা যুক্ত করে এবং পাহাড়ের জনগোষ্ঠীর জীবনে শান্তি আনয়নের যে আন্দোলন তাতে সামান্য ‘তা’ দেয় কিন্তু আখেরে মাকাল ফল উৎপাদন করে। কেননা, পাহাড়ের সার্বিক পরিস্থিতি গভীরভাবে উপলব্ধির ব্যর্থতা এবং তাকে যথাযথভাবে উপস্থাপন করবার অক্ষমতা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে। এখানে বলে নেওয়া জরুরি যে, আমিও ব্যক্তিগতভাবে পার্বত্য চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন চাই। আমিও মনে করি, এর যথাযথ বাস্তবায়ন পাহাড়ে পুরোপুরি না হলেও শান্তি আনয়নে যথেষ্ট এবং উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করবে। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের সঙ্গে আমার দীর্ঘ দিনের, দীর্ঘ বছরের গভীর বৌদ্ধিক-একাডেমিক সম্পৃক্ততার অভিজ্ঞতা থেকে আমি মনে করি, সেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে মূল সমস্যা কেবলই চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নয়; কেননা চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নই সমস্যা সমাধানের একমাত্র পথ নয়। চুক্তি বাস্তবায়নের পাশাপাশি, মোটা দাগে চারটি বিষয় অত্যন্তু গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে।
১. পাহাড় এবং পাহাড়ি আদিবাসীদের প্রতি রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি;
২. অতিরিক্ত সেনা-উপস্থিতি এবং পরোক্ষ সেনা-শাসন;
৩. ভূমি-সমস্যার স্থায়ী সমাধান;
৪. বাঙালি-সেটেলারদের সামাজিক ও রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব।

দুই.
বিশ্বখ্যাত নৃবিজ্ঞানী জেমস স্কট তাঁর বিখ্যাত কিতাব The Art of Not Being Governed (Scott, 2009)-এ চমৎকারভাবে দেখিয়েছেন ‘সমতল’ কীভাবে ‘পাহাড়’ নির্মাণ করে, শাসন করে এবং শোষণ করে। আধুনিক রাষ্ট্রের ধারণা, আবির্ভাব এবং কার্যকারিতা কীভাবে পাহাড় এবং পাহাড়ের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব হুমকির মুখে ফেলে দেয়। যার ফলশ্রুতিতে পাহাড় সবসময় রাষ্ট্রকে এড়িয়ে চলেছে এবং রাষ্ট্রের ‘উন্নয়নের লম্বা হাত’ থেকে দূরে থাকতে পালিয়ে বেড়িয়েছে। স্কট দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার জুমিয়া-অঞ্চলের ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতে তাঁর থিসিস দাঁড় করলেও দক্ষিণ এশিয়ার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এর অন্যথা হয়নি। তবে, পার্থক্য এতটুকুই যে, এখানে পাহাড় আধুনিক রাষ্ট্রগঠনের প্রক্রিয়ার সঙ্গে সবসময় সংযুক্ত হতে চেয়েছে, রাষ্ট্র থেকে পালিয়ে বেড়ায়নি। ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতীয় উপমহাদেশ যখন ভারত এবং পাকিস্তান দু’টি আলাদা রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়, পাহাড় এবং পাহাড়ের আদিবাসী নেতৃবৃন্দ তখন ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত হতে চেয়েছিল। কিন্তু এই জনগোষ্ঠীর আবেগ এবং আকাঙ্ক্ষায় কোনো ধরনের গুরুত্ব না দিয়ে, দেশবিভাগের সময় পার্বত্য চট্টগ্রামকে পাকিস্তানের (পূর্ব পাকিস্তানের) অন্তর্ভূক্ত করা হয়। ১৯৭১ সালে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জন্ম হলে, পাহাড়ের জনগোষ্ঠী একটি স্বতন্ত্র সত্ত্বা নিয়ে সাংবিধানিক কাঠমোয় বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্ভূক্ত হতে চাইল। রাষ্ট্র অতটুকু সামান্য উদারতাও দেখাতে পারেনি। সমস্ত অ-বাঙালিকে অর্থাৎ সাংস্কৃতিকভাবে ভিন্ন জাতিসত্ত্বার মানুষকে সাংবিধানিক কাঠামোর বাইরে রাখা হল। এরপরের ইতিহাস কারও অজানা নয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন হিসেবে উপস্থাপন করা হল যা পৃথিবীর অন্যান্য অনেক দেশের ক্ষেত্রেও আমরা হরহামেশা দেখে থাকি। কেননা, অধিকারবঞ্চিত, রাষ্ট্রযন্ত্র দ্বারা নির্যাতিত এবং ন্যায্য দাবি নিয়ে যখন সাংস্কৃতিকভাবে ভিন্ন জাতিগোষ্ঠী নিজেদের জাতিগত অধিকারের জন্য মুক্তির সংগ্রামে লিপ্ত হয়, রাষ্ট্রের ভাষায় তাঁরা হয়ে উঠে বিচ্ছিন্নতাবাদী [বিস্তারিত দেখুন: Appadurai 2006; Spencer 2007] ।পার্বত্য চট্টগ্রামকে রাষ্ট্রীয় পলিসির অংশ হিসেবে এক ধরনের সামরিকায়ন করা হল। এক হিসাব অনুযায়ী, সেখানে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর প্রায় এক তৃতীয়াংশ মজুত করা হয়েছিল [বিস্তারিত দেখুন: Mohsin, 2002:172]। এই সেনা মোতায়নের পেছনে কথিত শান্তিবাহিনীর কিছু সশস্ত্র কার্যক্রম অজুহাত হিসেবে হাজির করা হয় যা সর্বাংশে সত্য নয় (বিস্তারিত পরের অংশে)। প্রায় চার লক্ষ ভূমিহীন বাঙালি কৃষককে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসিত করা হল, যারা ‘বাঙালি সেটেলা’র হিসেবে পরিচিত। আদিবাসীদের জমি-জল-জঙ্গল হয়ে উঠল বাঙালি সেটেলারদের জীবন ও জীবিকার উৎস। আর তা পরিস্থিতি করে তুলল সংঘাতময়।

আখেরে লাভ হয় রাষ্ট্রের। নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে সেনাবাহিনীর বিরাট বহরকে পার্বত্য চট্টগ্রামে মজুদ রাখার বন্দোবস্ত পাকা হয়। তারপর পার্বত্য চুক্তি এবং চুক্তি-পরবর্তীকালে রাষ্ট্রের ভূমিকা, দৃষ্টিভঙ্গি এবং (অপ)তৎপরতা, পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নেতিবাচক অনুঘটকের ভূমিকা পালন করে। অতিসম্প্রতি, যখন সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী আনা হল, পাহাড়ি জনগোষ্ঠী সমতলের আদিবাসীসহ সংবিধানে নিজেদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি ও অন্তর্ভূক্তি চাইল, কিন্তু রাষ্ট্র এ সামান্য উদারতাটুকু দেখাতে কৃপণতা দেখাল। অধিকন্তু, রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘোষণা করা হল, বাংলাদেশে কোনো ‘আদিবাসী’ নেই। সংবিধানে সংযোজিত হল ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’। কোনো জাতি ক্ষুদ্র না বৃহৎ, একবিংশ শতাব্দীতে সেটা আর ‘ডেমোগ্রাফিক ফিগার’ বা জনগোষ্ঠীর সংখ্যার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় না [বিস্তারিত দেখুন: Uddin, 2014]। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ হিসেবে বিবেচনা করা মূলত রাষ্ট্রের একটি মেজরিটারিয়ান দৃষ্টিভঙ্গি। তাই, এ দৃষ্টিভঙ্গির আদর্শিক, দার্শনিক এবং গুণগত পরিবর্তন ছাড়া, কেবল পার্বত্য চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন দিয়েই পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।

তিন.
একবিংশ শতাব্দীর রাষ্ট্র-ব্যবস্থাপনায় সেনা-শাসনকে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার একটি বিপ্রতীপ বিন্দুতে প্রতিস্থাপন করে বিবেচনা করা হয়; কেননা সেনা-শাসনের অধীনে মানুষের মৌলিক, মানবিক এবং শাসনতান্ত্রিক অধিকার সুরক্ষিত হয় না। সেটা পরোক্ষ হোক আর প্রত্যক্ষ হোক। ইতিহাসে তার ভুরি ভুরি নজির আছে। বাংলাদেশেও এর অন্যথা হয়নি।
এখানে মনে রাখা জরুরি যে, এদেশের একজন সচেতন এবং সংবেদনশীল নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নানান গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা নিয়ে আমিও প্রীত। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কৃতিত্বপূর্ণ ভূমিকায়ও গৌরব বোধ করি। দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন দুর্যোগ মোকাবেলায় সেনাবাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। সম্প্রতি রানা প্লাজা ধ্বসের ঘটনায় উদ্ধারকার্যে সেনাবাহিনীর ভূমিকা সেনাবাহিনীর প্রতি আমার ইতিবাচক মনোভঙ্গি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই, আমি কোনো অবস্থাতেই সেনাবাহিনীর বিপক্ষে নই, কিন্তু সেনা-শাসনের বিপক্ষে। পাবর্ত্য চট্টগ্রামে কার্যত অফিসিয়াল কোনো সেনা-শাসন নেই, কিন্তু মানুষের নিত্যদিনের জীবনে সেনাবাহিনীর অতিরিক্ত উপস্থিতি (excessive presence) এবং পাবর্ত্য চট্টগ্রামে ‘সিকিউরিটি’র নামে অতিরিক্ত তল্লাশির ব্যবস্থাপনা মানুষকে এক ধরনের ভয়ের সংস্কৃতির মধ্যে বাস করবার পরিস্থিতি তৈরি করে দিয়েছে [দেখুন: রীয়াজ, ২০১৪]। তাই, পার্বত্য চট্টগ্রামে এক ধরনের প্রত্যক্ষ সেনা-শাসন জারি আছে বললে খুব একটা অত্যুক্তি হয় না। তাছাড়া, আমি পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রত্যন্ত গ্রামে-পাড়ায় গবেষণার কাজ করি। সেসব পাড়ায় সাধারণ পাহাড়ি গ্রামবাসীর কাছে মিলিটারি মানে হচ্ছে ‘সরকার’। তাই, মিলিটারি কীভাবে মানুষের নিত্যদিনের জীবনে হাজির হয় এবং পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবন কীভাবে রেগুলেট করে, তা পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ [বিস্তারিত দেখুন: রাহমান, ২০১৩]। কেননা, মিলিটারির আচরণ এবং ভূমিকা রাষ্ট্রের চরিত্র রিপ্রেজেন্ট করে। পার্বত্য চট্টগ্রামে মিলিটারি জাতীয় এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা রক্ষায় যে ভূমিকা রাখছে, তার পাশাপাশি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনেও এক ধরনের নেতিবাচক ভূমিকা পালন করছে। ফলে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে চরমভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়। যেমন, ‘ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্কিং গ্রুপ ফর ইনডিজেনাস অ্যাফিয়ার্স’ ২০১২ সালে একটি তালিকা প্রকাশ করেছে; সেখানে কীভাবে ২০০৪ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত মিলিটারি কর্তৃক মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে তার সবিস্তার বিবরণ আছে। যেমন, মিলিটারি কর্তৃক ১৫ জনকে হত্যা, ৩১ জনকে আহত, ২ জনকে ধর্ষণ, ১৬ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা, ৩২টি লুণ্ঠনের ঘটনা, ৫টি বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া, ৭টি মন্দির ভাঙচুর, ৪৬৪ জনকে গ্রেপ্তার, ৩৭৪ জনকে টর্চার, ১৫৪ জনকে প্রহার, ১৭টি পবিত্রতানাশের ঘটনা, ৮৫টি নাজেহালের ঘটনা, ২৮৫টি উচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে বলে এ রিপোর্টে প্রকাশ করা হয়েছে [IGWIA Report-14, 2012:15]।

একথা অপ্রিয় হলেও সত্য যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে সত্যিকার শান্তি প্রতিষ্ঠায় অতিরিক্ত সেনা-উপস্থিতি একটি বড় সমস্যা। কেননা, মূলত মিলিটারি হচ্ছে তৃতীয় বিশ্বে দেশে দেশে রাষ্ট্রের এক ধরনের ধ্রুপদী প্রতিনিধি [বিস্তারিত দেখুন: Eva, 2013]। কাজেই, পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অসংখ্য সেনা ছাউনি বলবৎ রেখে পার্বত্য চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের জিগির তুলে এবং সত্যি সত্যিই পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করেও সত্যিকার শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। হয়তো অনেকে বলবেন, পাবর্ত্য চুক্তি বাস্তবায়িত হলে, চুক্তির শর্তানুযায়ী অস্থায়ী সেনা ক্যাম্পগুলি স্থায়ীভাবে তুলে নেওয়া হবে। সেটা হলে ভালো, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই পরোক্ষ সেনা-শাসন যদি পার্বত্য চট্টগ্রামে জারি থাকে, এ অঞ্চলে কোনোদিনই শান্তি ফিরে আসবে না। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

চার.
জল-জমি-জঙ্গল আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকার সঙ্গে সম্পৃক্ত যা মহাশ্বেতা দেবী তাঁর লেখায় আদিবাসী মানুষের জীবনের প্রাণসঞ্চারণী হিসেবে এ ত্রয়কে বিবেচনা করেছেন [দেখুন: দেবী, ২০০৩ (১৯৭৭)]। শহুরে শিক্ষিত নাগরিক মধ্যবিত্তের যা বিনোদন, তা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবন ও সংস্কৃতি। আর যেহেতু এখনও পাবর্ত্য চট্টগ্রামের অধিকাংশ জনগোষ্ঠীর প্রধান জীবিকা জুম চাষ, সেহেতু ভূমি তার জীবনধারণের অন্যতম উৎস। তাই, পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি-সমস্যা এবং ভূমি-ব্যবস্থাপনা এতদঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে একটি অন্যতম প্রধান অন্তরায়। ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর থেকেই, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী বেশ কয়েক বার পার্বত্য ভূমি কমিশন গঠন করা হয়। হাঁকডাক দিয়ে কাজকর্ম শুরু করা হয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাজের কাজ কিছুই হয়নি। ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে এ পর্যন্ত পাঁচজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়, কিন্তু ভূমি-সমস্যার সমাধান হয়নি। একটি হিসাব মতে, ১৯৯৭ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ হাজার আবেদনপত্র জমা দেওয়া হয়েছে কমিশনে, ভূমি-বিরোধ সংক্রান্ত বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য। তন্মধ্যে, প্রায় দু’হাজার আবেদন ফয়সালা করবার জন্য নির্ধারণ করা হয়, কিন্তু এখনও পর্যন্ত একটিও ভূমি-বিরোধ নিষ্পত্তি হয়নি। এদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন, ২০০১-এর ১৩ টি সংশোধনীসহ পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি আইন, ২০১১ (সংশোধিত ২০১২) ২০১৩ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে জুলাইয়ের ৩০ তারিখ অনুমোদন করে একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যা পরবর্তী পার্লামেন্টের অধিবেশনে তোলার কথা ছিল, কিন্তু অদ্যাবধি তার সুরাহা হয়নি। সরকার এবং পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি হিসেবে জেএসএস, উভয় পক্ষ সম্মত হলেও কেন তা আদৌ আলোর মুখ দেখেনি, তার গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যাও সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়নি, যা উভয় পক্ষের মধ্যে পারষ্পরিক বিশ্বাস ও আস্থার সংকট আরও তীব্র করেছে।

অন্যদিকে বাঙালি সেটেলাররা এ সংশোধনীর সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করায় পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি-বাঙালির মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এ রকম একটি পরিস্থিতিতে বিচারপতি জনাব মোহাম্মদ আনোয়ারুল হককে ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরের ১৩ তারিখ পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি নিষ্পত্তি কমিশনের চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়, কিন্তু তিনিও একদিন মাত্র অফিস ভিজিট করে সংবাদপত্রে পোজ দিয়ে গায়েব হয়ে বসে আছেন; অন্তত দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রম আমার জানামতে শুরু হয়নি। এ হচ্ছে বিগত সতের বছরের পাবর্ত্য ভূমি কমিশনের কার্যক্রমের সালতামামি। কিন্তু ভূমি-সমস্যার দৃশ্যমান সমাধান এখনও পর্যন্ত হয়নি। এখানে উল্লেখ্য যে, ৯০ হাজারেরও বেশি পাহাড়ি ‘অভ্যন্তরীন উদ্বাস্তু’ হিসেবে বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবেতর জীবন যাপন করছে। অন্যদিকে প্রায় ১২,২২৩ পরিবারের ৬৪,৬১১ পাহাড়ি ভারতের ত্রিপুরা থেকে ফিরে আসা‘ প্রত্যাগত উদ্বাস্তু’ হিসেবে বর্তমানের পার্বত্য চট্টগ্রামে অবস্থান করছে, কিন্তু এখনও নিজ ভূমি থেকে বিতাড়িত [Amnesty International Report, 2013]। এত বিপুল সংখ্যক লোককে কীভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে জায়গা করে দেওয়া হবে, সে বিষয়ে সরকারের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা নেই কিংবা দৃশ্যমান পরিকল্পনা নেই। অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং সরকারি, বেসরকারিভাবে নানান অজুহাতে ভূমি দখলের মধ্য দিয়ে জুমচাষের জমি ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে; ফলে অসংখ্য পাহাড়ি জুম চাষ করবার জন্য পর্যাপ্ত জমি পাচ্ছেন না। এ রকম একটি অবস্থায় কেবল পার্বত্য চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করেই পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ফিরিয়ে আনা যাবে না। পাহাড়ি মানুষজনকে মাথা গুঁজবার জায়গা দিতে হবে; তাদের খেয়ে-পরে বেঁচে থাকবার ব্যবস্থা করে দিতে হবে; তাদের জমি-জল-জঙ্গল তাদেরকে ফিরিয়ে দিতে হবে। অন্যথায়, শান্তি একটি চিরন্তন অশান্তির চাদরে মোড়া থাকবে।

পাঁচ.
পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে বাঙালি সেটেলারদের বিষয়টি সঠিকভাবে হ্যান্ডেল করতে না পারা। পার্বত্য চুক্তির কোন জায়গায়, কোন ধারায় কিংবা উপধারায় সুষ্পষ্টভাবে বাঙালি সেটেলারদের পার্বত্য অঞ্চল থেকে পর্যায়ক্রমে কখন, কোথায় এবং কীভাবে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে, তার কথা লেখা নেই। কিন্তু এ বিষয়ে একটি অলিখিত চুক্তি হয়েছে স্বাক্ষরকারী দুই পক্ষের মধ্যে, এ রকম একটি ধারণা এখন মোটামুটি সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু ১৯৭৯-’৮১ সালে পর্যায়ক্রমে ৪ লাখ বাঙালিকে রাষ্ট্রের পলিসির অংশ হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রামে অভিবাসন করানো হলেও বিগত তিন দশকেরও বেশি সময় পরে সে সংখ্যা এখন প্রায় দ্বিগুণে পরিণত হয়েছে। তাছাড়া, ১৯৭৯-’৮১ সালের সেই সেটেলার বাঙালিরা এখন আর অত নিরীহ, অসহায়, গোবেচারা প্রকৃতির নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পার্বত্য অঞ্চলের ভোটের রাজনীতি। যুক্ত হয়েছে আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপির ক্ষমতার রাজনীতি। ফলে, বহুমাত্রিক রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসরত বাঙালি সেটেলাররা নিজেরাই একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক শক্তি হয়ে উঠেছে। গঠন করেছে ‘সমঅধিকার আন্দোলন’ নামে একটি সংগঠন। এ সংগঠনকে সব ধরনের সহযোগিতা দিচ্ছে স্থানীয় সিভিল এবং মিলিটারি প্রশাসন– এ মর্মে নানান অভিযোগ রয়েছে পাহাড়িদের মধ্যে। তাছাড়া, বাঙালি সেটেলারদের অনেকে মনে করেন, ‘পার্বত্য চুক্তির মাধ্যমে গোটা পাবর্ত্য চট্টগ্রামকে পাহাড়িদের কাছে যেন লিজ দিয়ে দেওয়া হয়েছে।’ অনেক বাঙালি সেটেলার মনে করেন, ‘পাহাড়িরা বাংলাদেশের নাগরিকই নন। তারা এসেছে ভারত এবং বার্মা থেকে। তারা পার্বত্য চট্টগ্রামে বহিরাগত!’ এ ধরনের অত্যন্ত নেতিবাচক মনোভাব এবং মনস্তত্ত্ব নিয়ে বাঙালি সেটেলারদের অনেকে পাহাড়িদের বিবেচনা করেন এবং সে মোতাবেক আচরণ করেন। তাই, বাঙালি-সেটেলারদের সামাজিক ও রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বের ইতিবাচক রূপান্তর ছাড়া পাবর্ত্য চট্টগ্রামে সত্যিকার অর্থে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।

এখানে মনে রাখা জরুরি যে, পাবর্ত্য অঞ্চলে অনেক বাঙালি, যারা সেটেলার নন, দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন, তাদের অনেকের সঙ্গে অত্যন্ত সুন্দর এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে পাহাড়িদের। অনেকের সঙ্গে রয়েছে নানান ধরনের ব্যবসায়িক এবং যৌথ মালিকানার নানান কার্যক্রম। দীর্ঘদিনের পারষ্পরিক আদান-প্রদানের ভেতর দিয়ে, নানান সামাজিক মিথষ্ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এসব স্থায়ী বাঙালিদের সঙ্গে রয়েছে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অত্যন্ত সুন্দর সম্পর্ক [বিস্তারিত দেখুন: চৌধুরী, ২০১৪] । সমস্যা রয়ে গেছে সেটেলার-বাঙালিদের মধ্যে, যাদের অনেকেই পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কোনো লেভেলেই কোনো রকম ইন্টোগ্রেশন করবার চেষ্টাই করেননি। অধিকন্তু, পাহাড়িদের জায়গা দখল করা, জমির ফসল চুরি করা, জুমের শস্য লুট করা, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি করা, পাহাড়ি নারীদের ধর্ষণ, পাহাড়ি গ্রামে অগ্নিসংযোগ এবং খুন করবার মতো অসংখ্য ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততার প্রমাণ রয়েছে এসব বাঙালি সেটেলারদের। তাই, সেটেলার সমস্যার একটা দীর্ঘমেয়াদি এবং সর্বজনগ্রাহ্য সমাধান ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামে কোনোভাবেই স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।

শেষের কথা
শুরুর কথাই মূলত শেষের কথা। আর মাঝখানটাই কিছু তথ্য-উপাত্ত, বাস্তবতা এবং কিছু বাস্তব অভিজ্ঞতার তাত্ত্বিক বয়ান। এটা আমাদের মনে রাখা জরুরি যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস, এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী মানুষের জীবনের ইতিহাস অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার নিত্য সংগ্রামের ইতিহাস [দেখুন: Uddin, 2005]। বহু রক্তক্ষরণের পর দীর্ঘ আড়াই যুগের প্রায় যুদ্ধাবস্থা থেকে একটি যৌথ চুক্তির মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীদের জীবনে একটি শান্তির জীবন যাপন করবার যে আকাঙ্ক্ষা এবং স্বপ্ন জন্ম হয়েছিল আজ থেকে সতের বছর আগে, তা ক্রমান্বয়ে ফেকাসে হয়ে হতাশার দীর্ঘ হাত ধরে বেদনায় ‘নীল’ (কষ্টের রঙ) হয়ে উঠছে। সম্প্রতি সরকার এবং জেএসএস-এর মুখোমুখি অবস্থানের কারণে সে ‘নীল’ কষ্ট আবার ‘লাল’ হয়ে উঠবার আশংকা তৈরী করছে। সেটা কারও কাম্য নয়। তাই, পাবর্ত্য চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের জন্য দ্রুততম সময়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়াটা জরুরি। আর যদি পার্বত্য চুক্তির যথাযথ বাস্তাবায়ন হয়, তবে উপরোল্লিখিত চারটি প্রধান প্রতিবন্ধবকার বেশ কয়েকটি (মিলিটারি ইস্যু, ভূমি-সমস্যা এবং সেটেলার সমস্যা) বিষয় আপনা আপনিই সুরাহা হয়ে যাবে। এর সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে আরও কিছু মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা আমি নিবন্ধের গতরে সবিস্তারে আলোচনা করেছি।

সবচেয়ে বেশি জরুরি, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে তাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার ফিরিয়ে দিতে আমাদের সামাজিক মনস্তত্ত্ব এবং রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির গুণগত এবং ইতিবাচক পরিবর্তন আনা। এই জনগোষ্ঠীর ন্যায্য অধিকার এবং যথাযথ মর্যাদার বিষয়টি কেবল মেনে নেওয়াই যথেষ্ট নয়, আন্তরিকতার সঙ্গে মনেও নিতে হবে।


তথ্যসূত্র:

১. Amnest International Report. 2013.Push to the Margin: Indigenous Rights Denied in Bangladesh’s Chittagong Hill Tracts. London, UK: Amnesty International.

২. Appadurai, Arjun (2006). Fears of Small Numbers: An Essay on the Geography of Anger. Durham and London: Duke University Press.

৩. Eva, Gerharz. 2013. “Beyond and Beneath the Nation-State: Bangladeshi Indigenous People’s Activism at the Crossroads.” Working Papers in Development Sociology and Social Anthropology, no. 372. Bielefeld: University of Bielefeld.

৪. International Group of World’sIndigenous Affairs. 2012. Militarization of the Chittagong Hill Tracts, Bangladesh, IGWIA report-14, Netherlands.

৫. Mohsin, Amena. 2002. The Politics of Nationalism: A Case of the Chittagong Hill Tracts of Bangladesh. Dhaka: the University Press Limited.

৬. Spencer, Jonathan.2007. Anthropology, Politics and the State: Democracy and Violence in South Asia.Cambridge: Cambridge University Press

৭. Scott, James. 2009. The Art of Not Being Governed. Yale: Yale University Press

৮. Uddin, Nasir. 2014. “Beyond Political and Cultural Binary: Understanding Indigenous Activism from Below.” Paper presented at a workshop titled Indigenous Activism in Bangladesh: A Critical Perspective organized by the Department of Anthropology, the London School of Economics and Political Sciences, March 18, 2014.

৯. Uddin, Nasir. 2005. “History is the Story for Existence: A Case Study of Chittagong Hill Tracts.” Asian Profile 33, no. 4: 391–412.

১০. চৌধুরী, মোক্তার আহমেদ, “অন্য’র সাথে পাড়া-বাস: পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালি-পাহাড়ি সম্পর্কের স্বরূপ”, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি পত্রিকা, (রিভিউয়াধীন), ২০১৪।

১১. দেবী, মহাশ্বেতা, “অরণ্যের অধিকার” (১৯৭৭), মহাশ্বেতা দেবী রচনাসমগ্র-০৮, সম্পাদনা: অজয় গুপ্ত, কলকাতা: দে’জ পাবলিশিং, ২০০৩।

১২. রীয়াজ, আলী, ভয়ের সংস্কৃতি: বাংলাদেশের আতঙ্ক ও সন্ত্রাসের রাজনৈতিক অর্থনীতি, ঢাকা: প্রথমা, ২০১৪।

১৩. উদ্দিন, রাহমান নাসির, “পাবর্ত্য শান্তিচুক্তি: দেড় দশকের কীর্তন”, দৈনিক ভোরের কাগজ, ২০ মার্চ, ২০১৩।

Tuesday, December 31, 2013

মানবতার চাদরে রাজনৈতিক চরিত্র ঢাকার রাজনীতি!

[বিডিনিউজ২৪.কম, ০৯/১২/২০১৩]

[লেখাটি 'জীবিত ম্যান্ডেলা, মৃত ম্যান্ডেলা' শিরোনামে বিডিনিউজ২৪.কম-এর মতামত বিশ্লেষণ পাতায় ০৯/১২/২০১৩ তারিখ ছাপা হয়েছে। কিন্তু এ লেখাটিতে চৌদ্দটি তথ্যসূত্র ছিল, যা প্রকাশিত লেখাটিতে মিসিং হয়ে গেছে। আগ্রহী পাঠকের জন্য তথ্যসূত্রসহ লেখাটি এখানে নোট আকারে পোষ্ট করা হলো।]

চামড়ার রাজনীতি এবং আধিপত্য থেকে আফ্রিকার কালো মানুষের মুক্তিদাতা হিসাবে বিশ্বব্যাপী নেলসন ম্যান্ডেলার যে ভাবমূর্তি তৈরী হয়েছে, সেটা দেশে দেশে রাষ্ট্রের চরিত্র, আমজনতার হাল-অবস্থা, বিশ্বমানবতার বা মানুষের ন্যায্য অধিকারের প্রশ্নে এবং আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের ফ্রেমওয়ার্কে সময়ের পরিক্রমায় নানান মাত্রা লাভ করেছে। আফ্রিকার দেশে দেশে তো বটেই, বাদবাকি বিশ্বেও নেলসন ম্যান্ডেলার অবস্থান, গ্রহণযোগ্যতা এবং দর্শন নানান মাত্রায় গৃহীত (বা নিগৃহীত !) হয়েছে। তাই, তার পরিচিতি কোন কোন সময় বিশ্বরাজনীতির চরিত্র, নয়া-পুঁজিবাদি বিশ্বের চালক ও চলক, মার্কিন ও তার সহযোগীদের যুদ্ধবাজ পররাষ্ট্রনীতি এবং আন্তর্জাতিক কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থের বাটখারায় মাপজোক করে উপস্থাপিত হয়েছে। উপস্থাপনার এ রাজনীতি তাঁর মৃত্যুর পরেও সমান তালে জারি আছে। তাই, নেলসন ম্যান্ডেলাকে একজন মানবতাবাদি, মহান ব্যক্তিত্ব, শান্তির দূত, আত্মত্যাগের মহান আদর্শ, পারসন অব উইজডম, সহনশীলতার উদাহারণ এবং আধুনিক দক্ষিণ আফ্রিকার স্রষ্টা প্রভৃতি বিশেষণের আবরনে ঢেকে দেয়া হচ্ছে। অবশ্যই নানান বিচারে ম্যান্ডেলার ব্যক্তিত্বের এবং কৃতকর্মের নানান বিবেচনায় এসব বিশেষণেরও যথার্থ ন্যায্যতা খুঁজে পাওয়া যাবে। কিন্তু নেলসন ম্যান্ডেলার বিপ্লবী রাজনৈতিক দর্শন কী ছিল, বিশ্বরাজনীতিতে তাঁর অবস্থান কী ছিল, সমাজতান্ত্রিক বনাম পুঁজিবাদি বিশ্বের রাজনীতিকে ম্যান্ডেলা কীভাবে দেখতেন, আমেরিকা-বৃটিশ-ইজরাইল নেক্সাসকে ম্যান্ডেলা কীভাবে সনাক্ত করেছিলেন, যুদ্ধবাজ মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিকে ম্যান্ডেলা কীভাবে সমালোচনা করেছেন এবং বৈশ্বিক পরিম-লে আন্তঃরাষ্ট্রীয় রাজনীতির অসম সম্পর্ককে ম্যান্ডেলা কীভাবে বিবেচনা করতেন প্রভৃতি বিষয়-আশয় অদ্যাবধি সাম্রাজ্যবাদি পশ্চিমের জন্য যথেষ্ট বিব্রতকর এবং ভীতিকর বলেই, মৃত্যুর পর একজন আজন্ম বিপ্লবী ম্যান্ডেলাকে মানবতার চাদরে ঢেঁকে দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক চরিত্রকে আড়াল করবার একটা সুক্ষ্ম রাজনীতি আমরা লক্ষ করছি। এ নিবন্ধে তার সামান্য খোঁজ-খবর নেয়া চেষ্টা করা হয়েছে।

নেলসন ম্যান্ডেলার মৃত্যুর সংবাদে অত্যন্ত স্বাভাবিক কারণেই, এবং প্রত্যাশা মোতাবেকই, তামাম দুনিয়ায় শোকের মাতম উঠেছে। পৃথিবীর দেশে দেশে সাধারণ গণমানুষ তথা নিচতলার মানুষের মধ্যে, নিপীড়িত, নির্যাতিত, বঞ্চিত মানুষের মধ্যে এক ধরনের স্বজন হারানোর বেদনা যেমন ডুঁকরে উঠছে, তেমনি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দেশে সমাজের উঁচুতলার মানুষের মধ্যেও বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রকাঠামোর ব্যবস্থাপনার সমাজের সুবিধাভোগী শ্রেণিও ম্যান্ডেলার মৃত্যুতে শোকগাঁথা রচনা করছেন। এমনকি নানান মাত্রায় বর্ণবাদের চেয়ে ভয়াবহ অসম সম্পর্ককে যারা সমাজে নিষ্ঠার সাথে জারি রেখেছে, এবং নিজেদের শ্রেণি স্বার্থের জন্য নানান ছদ্মবেশে বর্ণবাদি রাজনীতির প্রয়োগ করছে, তারাও বর্ণবাদ-বিরোধী এ মহান নেতাকে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাচ্ছে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হচ্ছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট, বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী এবং ইজরাইলের প্রধানমন্ত্রী, যারা ম্যান্ডেলার জীবতাবস্থায় বিশেষ করে তার সক্রিয় বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনের সময়কালে ম্যান্ডেলাকে সন্ত্রাসী, কমিউনিষ্ট (গালি অর্থে!), নিকৃষ্ট প্রাণি বলে সকাল বিকাল গালি দিতেন, তারাও বিশেষণের প্রাবল্যে এবং সম্মানের ফুলঝুঁড়িতে তাদের বক্তব্যকে ভরে দিচ্ছেন ম্যান্ডেলার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করতে গিয়ে। মৃত্যু মানুষকে মহান করে দেয় কেননা মৃত্যু মানুষকে সবধরনের হিসাব নিকাশের উর্ধ্বে নিয়ে যায়। তাই, মানুষের মৃত্যুর শোকগাঁথা সাধারণত সকল প্রকার ইহজাগতিক স্বার্থের উর্ধ্বে মানুষের মনের গভীর থেকে আপনা-আপনি সঞ্চারিত হয়। কিন্তু মানুষের সার্বজনীন মানবতাবাদের বিপ্রতীপে গিয়ে মার্কিন, বৃটিশ এবং ইজরাইলের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতেও এক ধরনের উপস্থাপনার রাজনীতি লক্ষ করা যায়, যেখানে পুঁজিবাদি বিশ্বের সাথে সমাজতন্ত্রী বিশ্বের, পশ্চিমা বনাম বাদবাকি বিশ্বের অসম সম্পর্ক, প্রভুত্বের ইতিহাস এবং ঔপনিবেশিক মানসিকতার একটা আভাস পাওয়া যায়। সবচেয়ে গুরুতর বিষয় হচ্ছে, ম্যান্ডেলাকে এসব রাষ্ট্র মৃত্যু-উত্তর কীভাবে, কোন ভাষায় এবং কোন মর্যাদায় সম্মান করছে তার ভেতর দিয়ে সেসব রাষ্ট্রের তথাকথিত মানবতাবাদি এবং উদার গণতান্ত্রিক একটি ইমেজকে বাজারে বিনামূল্যে প্রচার করবার একটা মওকা হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। অর্থাৎ মৃত্যুর পরও ম্যান্ডেলা মার্কিন-বৃটিশ-ইজরাইল নেক্সাসের উপস্থাপনায় ব্যবহৃত হচ্ছে রাজনেতিক উপাত্ত হিসাবে। বিষয়টা তথ্য প্রমাণসহ ব্যাখ্যা করা যাক।   

নেলসন ম্যান্ডেলার মৃত্যুর পরপরই হোয়াইট হাউস থেকে একটি অফিসিয়াল ষ্ট্যাটমেন্ট দেয়া হয় যার প্রথম বাক্য হচ্ছে, ‘আজকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার একজন নিকট বন্ধুকে হারাল’ [১]; অথচ ২০০৮ সাল পর্যন্ত এ নিকট বন্ধু নেলসন ম্যান্ডেলা ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরী করা টেররিষ্টদের তালিকায় [২]; ম্যান্ডেলার প্রতি শোক-বক্তব্য রাখতে গিয়ে আমেরিকার ভাইস-প্রেসিডেন্ট তার বক্তব্যে শেষ করেন ছোট একটি বাক্য দিয়ে তিনি একজন ভাল মানুষ ছিলেন’ [৩]; ম্যান্ডেলাকে ভাল মানুষ হিসাবে আখ্যায়িত করে প্রকারান্তরের নিজেকে একজন ভাল মানুষ হিসাবে জাহির করার রাজনীতি! অথচ ২০০৩ সালে আমেরিকা যখন তার নেতৃত্বের অন্যান্য অক্ষ শক্তি নিয়ে ইরাক আক্রমণ করতে যাচ্ছিল, নেলসন ম্যান্ডেলা তখন তার সমালোচনা করায়, যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট এ ভালো লোক’-টি সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘একজন দুশ্চরিত্রের মার্কিন বিরোধী এবং সাদ্দামের একনিষ্ট সাপোর্টারের কাছ থেকে মার্কিন বিরোধীতা নতুন কোন ব্যাপার নয়, কেননা তিনি হচ্ছে একজক দীর্ঘদিনের কমিউনিষ্ট এবং সন্ত্রাসীদের মদদদাতা’ [৪]; ম্যান্ডেলাকে সন্ত্রাসীদের হিসাবে উপস্থাপনার অবিরাম কসরত এখনও মার্কিন মুলুকে অত্যন্ত যত্মের সাথে -- বিশেষ করে রাজনীতিকি এবং একাডেমিক প-িতদের কাছে -- জারি আছে। পিটার বিইনার্ট চমৎকার বলেছেন, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিক এবং একাডেমিক পণ্ডিতরা নব্বইয়ের দশকের কোল্ড-ওয়ারকে বর্ণনা করেন দুটি শক্তির- একটি হচ্ছে মার্কিন সমর্থিত মুক্তির শক্তি (ফোর্সেস অব ফ্রিডম) এবং অন্যটি হচ্ছে সোভিয়েত সমর্থিত নিষ্ঠুরতার শক্তি (ফোর্সেস অব টাইরানি)- যুদ্ধ হিসাবে। যেখানে ম্যান্ডেলা নিষ্ঠুরতার পক্ষে ছিলেন’ [৫]; কিন্তু সেই নিষ্ঠুরলোকটির মৃত্যুর পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এমন দরদি হয়ে উঠেছে যে খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তার ভাষণে ঘোষণা করেছেন যে, আগামী ৯ ডিসেম্বর সকাল থেকে সুর্যাস্ত পর্যন্ত নেলসন ম্যান্ডেলার সম্মানে হোয়াইট হাউজ, সমস্ত সরকারী প্রতিষ্ঠান এবং সেনা-স্থাপনাগুলোতে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে [৬] । দুশ্চরিত্রের কমিউনিষ্ট’, ‘সন্ত্রাসীএবং সন্ত্রাসীদের মদদদাতার মৃত্যুতে খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, যা সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপি সশস্ত্র জেহাতে লিপ্ত, কমিউনিষ্টদের জাত-শত্রুতে পরিণত করা একটি দেশ, কেন তার প্রতি এতো বড় সম্মান দেখাচ্ছে? এখানেই রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত উদার-গণতন্ত্রের গলাবাজি, মানবতাবাদের দোহাইকে জায়েজ করবার এবং মানবতাবাদের চাদর দিয়ে নেলসন ম্যান্ডেলার অস্তিত্বের যে রাজনৈতিক সত্ত্বা তাকে আঁড়াল করবার সাম্রাজ্যবাদি কূট-কৌশল।

বৃটিশকুলও এ কূটকৌশলের রাজনীতিতে কম পাকাপোক্ত নন। নেলসন ম্যান্ডেলার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করতে গিয়ে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরুন তো রীতিমত সবাইকে টেক্কা দিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘নেলসন ম্যান্ডেলা কেবল আমাদের সময়ের হিরো নন, তিনি সবসময়ের সর্বকালের হিরো’ [৭];  অথচ এ ডেভিড ক্যামেরুনই ১৯৮০ দশকে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন, তখন তার রুমে হ্যাঙ্গ ম্যান্ডেলা’’ বা ম্যান্ডেলাকে ফাঁসিতে ঝোঁলাওশিরোনামে একটি ছবি টাঙিয়ে রাখতেন [৮] , যা নিয়ে সম্প্রতি সামাজিক মিড়িয়াতে ব্যাপক ঝড় বয়ে যাচ্ছে। নেলসন ম্যান্ডেলার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করতে গিয়ে তাঁকে তার সময়ের নায়ক হিসাবে অভিহিত করায় বিশ্বমিড়িয়ায় ইতোমধ্যে ডেভিড ক্যমেরুনকে হিপোক্রেটহিসাবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। উপমহাদেশের বিখ্যাত সাংবাদিক এম জে আকবর দ্যা সানডে গার্ডিয়ানে’-এ এই হিপোক্রেটের হিপোক্রেসির চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছেন [৯]; ম্যান্ডেলার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে গিয়ে সাবেক বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার বলেছেন, ‘তিনি ছিলেন একজন শ্রেষ্ঠ মানুষ কেননা তিনি মানুষের মধ্যকার শ্রেষ্ঠত্বটাকেই বের করে আনতে পেরেছিলেন। মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব আপনি তখনি উপলব্ধি করবেন, আপনি যদি তার সাথে বা তার সাহচর্যে থাকবেন [১০]; অথচ ২০০২ সালে ম্যান্ডেলা যখন ওয়ার অন টেররিজমের নামে আফগানিস্তানে মার্কিন-বৃটিশ আক্রমনের সমালোচনা করেন, এ টনি ব্লেয়ারই নেলসন ম্যান্ডেলাকে অর্থাৎ তার ভাষায় একজন শ্রেষ্ঠ মানুষকে পৃথিবীর নিকৃষ্টতম মানুষ বলে গালি দিয়েছিলেন। এটাই সাম্রাজ্যবাদি রাষ্ট্রনীতির নীতিহীন রাজনীতি। তাদের প্রয়োজনে যেমন তারা কাউকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষবানাতে পারে আবার তাদের প্রয়োজনেই তারা একই মানুষকে পৃথিবীর নিকৃষ্ঠতমানুষ হিসাবে উপস্থাপন করতে পারে। ইরাক, আফগানিস্তান এবং প্যালেষ্টাইনের প্রশ্নে ম্যান্ডেলার অবস্থান র‌্যাডিক্যাল ছিল বলেই ইঙ্গ-মার্কিন শক্তি ম্যান্ডেলাকে নিকৃষ্টতম মানুষহিসাবে ব্যাখ্যা করেছেন [১১] ।    

ইজরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মন্তব্য আরো চমকপ্রদ। নেলসন ম্যান্ডেলার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘মানুষ তাঁকে [নেলসন ম্যান্ডেলাকে] মনে রাখবে একটি নতুন দক্ষিণ আফ্রিকার পিতা হিসাবে এবং নৈতিকতার বিচারে একজন শ্রেষ্ঠ মরাল লিডারহিসাবে’ [১২]; এ নিতানিয়াহুই ম্যান্ডোলাকে ইয়াসির আরাফাতের পরে ইজরাইলের সবচেয়ে বড় শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করেছিলেন। ১৯৯০ সালের ফেব্রুয়ারীতে তার মুক্তির প্রায় দুই সপ্তাহ পর যখন প্যালেষ্টাইনের অবিসংবাদিত নেতা ইয়াসির আরাফাতকে আলিঙ্গন করে ম্যান্ডেলা বলেছিলেন, ‘ইজরাইল হচ্ছে একটি টেররিষ্ট রাষ্ট্র যারা নিরস্ত্র এবং নিরীহ আরবদেরকে নিষ্ঠুরভাবে জবাই করছে’ '[১৩] , এ নেতানিয়াহুই তখন ম্যান্ডেলাকে ইজরাইলের শক্র হিসাবে চিহ্নিত করেছিলেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে তাহলে কী এমন ঘটেছে যে, ইজরাইলের চিরশত্রু হঠাৎ করে মরাল লিডারেপরিণত হলেন?

এটাই উপস্থাপনার রাজনীতি। মার্কিন-বৃটিশ-ইজরাইলের এ নেক্সাসকে ম্যান্ডেলা যত চমৎকারভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন এবং তাদের সম্মিলিত অন্যায়কে যখন বাদবাকি বিশ্ব অনেকটা মনে না-নিলেও মেনে নেয়ার নীতি নিয়ে রাজনীতি করছিলো, ম্যান্ডেলা তখন উচ্চকন্ঠে তার প্রতিবাদ করেছিলেন এবং বিশ্ববাসীর কাছে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন এ তিন-বলয়ের যৌথ মিথ্যাচার, তিন-এলাইয়েন্টের সাম্রাজ্যবাদি-আধিপত্যবাদি পররাষ্ট্রনীতি এবং এ তিন-মিত্র কতৃক বিশ্বব্যাপি জারি রাখা সাদা বনাম কালোর রাজনীতির হিডেন এজেণ্ডা। ইরাক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে গিয়ে ২০০২ সালে ম্যান্ডেলা বলেন, ‘বুশ এবং ব্লেয়ার কেউই কোন ধরনের প্রমাণ দিতে পারেনি যে ইরাকের কাছে জীবন বিধ্বংসী মারাত্মক কোন অস্ত্র আছে। অথচ আমরা সবাই জানি, ইজরাইলের কাছেই বরঞ্চ এ ধরনের অস্ত্র আছে। কিন্তু আমরা সেটা নিয়ে কোন কথা বলি না। কেন এক দেশের জন্য এক নীতি আর অন্য দেশের বেলায় অন্য নীতি? তার কারণ একটা হচ্ছে ব্ল্যাক আরেকটা হচ্ছে হোয়াইট’ [১৪]; ম্যান্ডেলা এভাইে মার্কিন-বৃটিশ-ইজরাইলের বর্ণবাদি রাজনীতির মুখোশ উন্মোচন করেছিলেন। কিন্তু আজ যখন ম্যান্ডেলা জীবনের পরপারে পাড়ি দিয়েছেন, তখন তাঁকে উপস্থাপন করা হচ্ছে মহান মানবতাবাদি হিসাবে, সময়ের হিরো, শ্রেষ্ঠ মানুষ কিংবা মরাল লিডার হিসাবে। আর এ আখ্যা দেয়ার ভেতর দিয়ে তাঁকে একধরনের সূফি, দরবেশ কিংবা চার্চের পাদ্রি মার্কা নরমেটিভ, অবজেক্টিভ এবং আ-পলিটিক্যালইমেজ দেয়া হচ্ছে কেননা ম্যান্ডেলার রাজনৈতিক দর্শনের গুণকীর্তন করা এবং তার রাজনৈতিক দর্শনকে বাঁচিয়ে রাখার চিন্তা করা প্রকারান্তরে মার্কিন-বৃটিশ-ইজরাইলের আধিপত্যবাদি পররাষ্ট্রনীতির জন্য হুমকিকেই জিইয়ে রাখার সমান। অন্যদিকে, এসব অতি মানবীয়, অতি মহান এবং হাইপার-ডোস পারসনালিটি ডিসকোর্স দিয়ে নেলসন ম্যান্ডেলাকে সম্মান দেখানোর ভেতর দিয়ে মূলত তারা নিজের দেশের--মার্কিন, বৃটিশ এবং ইজরাইল--মানুষের কাছে নিজের উদার-নৈতিক গণতন্ত্রেরযেমন একটি পাবলিসিটির ষ্পেস তৈরী করছেন, অন্যদিকে বিশ্ববাসীর কাছে ম্যান্ডেলাকে সর্বোচ্চ সম্মান দেখানো মধ্য দিয়ে পশ্চিমা ঘরানার মানবতাবাদের বিশ্ববাজারে নতুন চাহিদা ও কদর তৈরী করছেন। তাই, ম্যান্ডেলাকে অতি মানবীয় ব্যক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠার এই প্রয়াস। এটা মূলত: মানবতার চাদরে ম্যান্ডেলার রাজনৈতিক সত্তাকে ঢেকে দেয়ার একটা রাজনীতি। ধন্যবাদ ম্যান্ডেলা, জীবতকালে যেমন তুমি এসব পুঁজিবাদি, সা¤্রাজ্যবাদি, আধিপত্যবাদি এবং সাদা-কালোর বর্ণবাদি রাজনীতির বিরুদ্ধে নিজের প্রতিবাদ-প্রতিরোধের ভেতর ভেতর দিয়ে খোদ নিজেকেই এক কালান্তরের কিংবদন্তি করে তুলেছো, তেমনি তুমি তোমার জীবনাবসানের মধ্য দিয়েও সাম্রাজ্যবাদি রাজনীতির যে কদর্য চেহারা তা আরো একবার উন্মোচিত করলে। তাই, জীবিত ম্যান্ডেলার চেয়ে মৃত ম্যান্ডেলা অধিকতর প্রেরণা-সঞ্চারি। নিখিল বিশ্বের শোষিত, বঞ্চিত, মেহনতি মানুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তি জন্য বৈশ্বিক রাজনীতিতে সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ এবং আধিপত্যবাদ বিরোধী যে লড়াই জারি আছে, সে লড়াইয়ে তুমি সবসময় এক অশেষ অনুপ্রেরণার উৎস হিসাবে ছিলে, আছে এবং থাকবে। ম্যান্ডেলা তোমার মৃত্যু আমাদের আরো বিপ্লবী করে তোলে। তাই, তুমি রবে নিরবে হৃদয়ে মম।    

তথ্যসূত্র:
[১]  হোয়াইট হাউসের অফিসিয়াল ওয়েভসাইট থেকে সংগৃহীত। প্রথম বাক্যটি হচ্ছে '‘Today,the United States has lost a close friend…’  পিডিএফ ফাইলে আপলোড করা ষ্ট্যাটমেন্ট। আগ্রহীরা হোয়াইট হাউজের ওয়েভসাইট ভিজিট করতে পারেন।
[২] “Nelson Mandelaremoved from US terror list”, The Daily Telegraph, 02 Jul 2008.[http://www.telegraph.co.uk/news/worldnews/africaandindianocean/southafrica/2233256/Nelson-Mandela-removed-from-US-terror-list.html]
[৩] Statement by the Vice President on the Death of NelsonMandela
[৫] Peter Beinart, “Don’tSanitize Nelson Mandela: He’s Honored Now, But Was Hated Then”, The Daily Beast, December 5, 2013, [Source:http://www.thedailybeast.com/articles/2013/12/05/don-t-sanitize-nelson-mandela-he-s-honored-now-but-was-hated-then.html]
[৭] David Cameron,Nelson Mandela: David Cameron pays tribute to 'hero', BBC December 5, 2013.[http://www.bbc.co.uk/news/uk-25248712]
[৯] M J Akber,Disciples of a deeper faith, The Sunday Guardian, December 07, 2013 [Source:http://www.sunday-guardian.com/analysis/disciples-of-a-deeper-faith]
[১০] Tony Blair,Mandela brought out the best in people', BBC, December 06, 2013. [Source: http://www.bbc.co.uk/news/world-25251984.]
[১১] Mehdi Hasan, “Lest We Forget, on Iraq, Afghanistan andIsrael, Mandela Was a Radical”HUFF PostPolitics, United Kingdom, December 07, [Source:http://www.huffingtonpost.co.uk/mehdi-hasan/nelson-mandela-iraq-israel_b_4396638.html?utm_source=Alert-blogger&utm_medium=email&utm_campaign=Email%2BNotifications]
[১২] The DailyHaaretz, December 06, 2013, [Source:http://www.haaretz.com/news/world/1.562059]
[১৩] The Global NewsJewish Source, October 25, 1990. [Source:http://www.jta.org/1990/10/25/archive/mandela-angers-australian-jews-with-fresh-anti-israel-rhetoric]
[১৪] “Mandela warnsBush on racism”, The Guardian,September 13, 2002. [Source:http://www.theguardian.com/world/2002/sep/13/iraq.nelsonmandela]| 

ডিসেম্বর ০৮, ২০১৩, জার্মানি। 
[প্রকাশিত: ০৯/১২/২০১৩, বিডিনিউজ২৪.কম]